![]() |
| 'নকশী কাঁথা' লোকজ ঐতিহ্য |
আবহমান বাংলার প্রতিটি শহর এবং গ্রামের সর্বত্র কাঁথার কদর যথেষ্টই রয়েছে প্রাচীন কাল থেকে। সারা বছরই প্রয়োজন অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো এই কাঁথা। শীতের জন্য লেপকাঁথা, বালিশে ব্যবহারের জন্য বয়তন, নামাজের জন্য জায়নামাজ কাঁথা, বসার জন্য আসন কাঁথা এবং খাবারের জন্য দস্তরখানসহ কাঁথার সহ আরো হরেকরকম কাঁথার প্রচলন ছিলো।তবে আগেকার দিনে প্রতিটি পরিবারে নকশী কাঁথার ব্যবহার ছিল ব্যাপক ও বহুবিধ৷
| নকশী কাঁথার কারুকার্য |
নকশী কাঁথা:
সাধারণত একাধিক পুরোনো শাড়ীর পরত দিয়ে কাঁথা তৈরী করা হয়। ফলে কাঁথা হয় মোলায়েম। কাঁথাকে লোকশিল্প হিসাবেও পরিগণিত করা হয়। সাধারণ কাঁথার উপর বিভিন্ন ধরনের রঙিন সুতা দিয়ে নকশা তুলে যে বিশেষ ধরনের কাঁথা বানানো হয়, তাই নকশী কাঁথা।বিশেষ উপলক্ষে ব্যবহৃত এই কাঁথাগুলোর নকশা নৈপূণ্যের সাথে কূশলী হাতে করা হয়। এক সময়ে মেয়েদের বিয়েতে কিংবা আত্মীয়-স্বজনকে কাঁথা উপহার হিসেবে দেয়ারও প্রচলন ছিল৷ স্নেহময়ী মা তার সন্তান, প্রেমময়ী স্ত্রী তার স্বামীর জন্য এবং নানি-দাদি, খালা-ফুফুরা পৃথিবীতে নতুন অতিথির আগমনকে সামনে রেখেও কাঁথা তৈরি করতো৷ তবে এ প্রচলন আজও একেবারে ফুরিয়ে যায়নি৷
![]() |
| নকশী কাঁথা |
ইতিহাস:
‘নকশী কাঁথা’ সূচিশিল্পের এক অপরিহার্য নিদর্শন।প্রাচীন কাল থেকেই বাংলাদেশের নারীরা তৈরি করছেন নকশী কাঁথা।সতীশচন্দ্র মিত্র তার ‘যশোর-খুলনার ইতিহাস’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘পাঠান আমলেই যশোর বস্ত্র শিল্পে সমৃদ্ধ ছিল। উৎকৃষ্ট তুলা উৎপাদনের কারণে এই সমৃদ্ধি অর্জন করা সহজ হয়। তাতে দেখা যায়, ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাৎ প্রায় ৭০০ বছর আগেও এই জনপদের বস্ত্র একটি পৃথক স্থান দখল করে নিয়েছিল’।রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, কুষ্টিয়া, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুর, রংপুর, দিনাজপুর অঞ্চল নকশী কাঁথার জন্য বিখ্যাত। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, বর্ধমান, বাঁকুড়া, উত্তর-দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, আসাম, বিহার, উড়িশাতেও রয়েছে নকশী কাঁথার ব্যবহার। ১৯৯৯ সালে ভারত নকশী কাঁথা নিজেদের নামে নিবন্ধন করে নেয়। পরে ২০০৮ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিহারের ‘সুজনী’ নকশী কাঁথা আন্তর্জাতিক ভৌগোলিক স্বীকৃতি পায়।
| নান্দনিক রূপ-রস |
নকশী কাঁথার বাহারি সেলাই:
নকশী কাঁথার সেলাই মানে গ্রাম বাংলার বধূ-কন্যারা মনের মাধুরী মেশানো রং দিয়ে সূঁচ আর সুতোর সাহায্যে সুনিপুণ হাতে নান্দনিক রূপ-রস ও বর্ণ-বৈচিত্র্যে ভরা কাঁথা শিল্পীর মনের ডায়েরি। এটি গ্রামীণ মহিলাদের শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত হলেও নকশী কাঁথা শিল্পের সাথে জড়িয়ে আছে আমাদের আর্থ-সামাজিক ইতিহাস ও ঐতিহ্য। রাজ-বাদশাদের জীবন কাহিনী, যুদ্ধ-বিগ্রহ, পৌরাণিক কিচ্ছা কথা, নর-নারীর প্রেম-বিরসহ অনেককিছু মিশে থাকে এ শিল্পের প্রতিটি বুননে। সূর্য, চাঁদ, গাছ, পাখি, মাছ, ফল, মানুষ, ময়ূরসহ বিভিন্ন নকশার সমাহার নকশী কাঁথায়।সেকালের নকশী কাঁথা আজো আছে এবং তৈরিও হচ্ছে৷ তবে বিবর্তনের ধারায় সময় ও চাহিদার প্রেক্ষিতে আমাদের ঐতিহ্যবাহী এ শিল্পকর্মেও লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া৷ নকশী কাঁথার চাহিদা এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এসেছে ব্যাপকতা ও নতুনত্ব৷ সমাদৃত হচ্ছে দেশের সীমা পেরিয়ে আজ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ৷ সেলাইয়ের ধরন অনুযায়ী কাঁথাগুলোর প্রকারভেদ করা হয়েছে। যেমন :
চলমান সেলাই- রাজশাহীর বিখ্যাত লহরী কাঁথা,যশোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত আনারসি কাঁথা। বাঁকা সেলাই- রাজশাহীর সুজনি কাঁথা।
বিভিন্ন ধরনের নকশী কাঁথা :
কাঁথা সাধারণত লেপের মতো মুড়ি দিয়ে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ধরনের কাঁথা গুলো হলো : ‘লেপ-কাঁথা’ আকারে বড় ও মোটা হয়। এক বর্গফুট আকারের রুমালে তৈরি নকশী কাঁথাই ‘রুমাল কাঁথা’। ‘আসন নকশী কাঁথা’ বসার আসন তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ভারী ও মূল্যবান জিনিসপত্র এবং কাপড় চোপড় ঢেকে রাখাতে ‘বস্তানি বা গাত্রি’ ধরনের নকশী কাঁথা ব্যবহার করা হয়। আরশির অর্থ আয়না। আর এই আয়না- চিরুনি ইত্যাদি ঢেকে রাখার জন্য যে নকশী কাঁথা ব্যবহার হয় তা ‘আরশিলতা’ নামে পরিচিত। খাবারের সময় ‘দস্তর খানা’ নামক নকশী কাঁথা মেঝেতে পেতে তার উপরে খাবার দাবার ও বাসনপত্র রাখা হয়। খাম আকারের যে কাঁথার মধ্যে কোরআন শরীফ রাখা হয় তাকে বলা হয় ‘গিলাফ’।
![]() |
| গ্রাম বাংলার রমণীরা বানিয়ে চলেছেন বাহারি নকশী কাঁথা |



একটি মন্তব্য পোস্ট করুন