ঘর সাজানোর খুঁটিনাটি
গৃহসজ্জা

ঘর সাজানোর খুঁটিনাটি


প্রত্যেকের রুচিশীলতার পরিচয় নির্ভর করে তার গৃহের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জার উপর। বাড়ির সজ্জা অপরিহার্য কারণ এটি কোনো ব্যক্তিকে কোথায় থাকে সে সম্পর্কে অনুভব করতে সহায়তা করে। বাড়ি কেবল এমন জায়গা নয় যেখানে ক্লান্তিকর দিন পরে আপনি ফিরে আসেন, তবে এটি এমন জায়গা হওয়া উচিত যেখানে ঘরের পরিবেশ আপনার মানসিক প্রশান্তি বাড়িয়ে তুলবে। পরিবারের সদস্যদের মানসিক প্রশান্তি বাড়ানোর জন্য সজ্জিত অভ্যন্তরগুলির সাথে সজ্জিত একটি ঘর চাই-ই-চাই। একটি সাজানো ঘর মানুষের যেমন মানসিক শান্তির জন্য প্রয়োজন , তেমনি শারীরিক সুস্থতার জন্যও অপরিহার্য। তবে চলুন জেনে নেই ঘর সাজানোর খুঁটিনাটি, কোন ঘরটি কিভাবে সাজালে আপনার গৃহের পরিবেশ হয়ে উঠতে পারে আপনার স্বর্গের নিবাস।

শোবার ঘরের সাজসজ্জা

 শোবার ঘরের সাজসজ্জা:
আপনার শোবার ঘর , একান্তই আপনার নিজস্ব জায়গা। আপনার ব্যক্তিগত পছন্দ মূলত শোবার ঘর দেখেই বোঝা যায়। এজন্য আপনার এই ব্যক্তিগত ঘরের সাজসজ্জাও হওয়া উচিত অনন্য।

সারাদিনের ক্লান্তি শেষে যে ঘরে বিশ্রাম নিবেন , সে ঘরের রং নির্বাচনে কিছু জিনিস মাথায় রাখতে হবে। শোবার ঘরে সাধারণত হালকা রং ব্যবহার করতে বলা হয়। ব্লু, লাইট গ্রীন, হোয়াইট, অফ-হোয়াইট, ক্রিম, লাইট ভায়োলেট ইত্যাদি রং খুব ক্লাসি, সেই সাথে বিজ্ঞানসম্মত যে এই রং গুলোই ঘুম ভালো হয়, আপনার চোখকেও প্রশান্তি দেয়। 

আপনার পছন্দের রং যদি খুব গাঢ় হয়, তবে এক দেয়ালে সে রং টি করা যেতে পারে। বাকি তিন দেয়ালে ম্যাচিং লাইট শেডের  রং ব্যবহার করাতে পারেন।শোবার ঘরে খুব ডার্ক রং ব্যবহার না করাই শ্রেয়। যেমন , লাল রং অনেক ক্ষেত্রে রাগ, বিরক্তি অথবা অস্থিরতা এনে দেয়।
শোবার ঘরে আসবাবপত্র নির্বাচনেও বিশের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। যত সম্ভব শোবার ঘরে কম আসবাবপত্র রাখবেন। আসবাবপত্রগুলো যাতে ঘরের সাথে মানানসই সাইজের হয় সেদিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। বেশি বড় আকারের আসবাবপত্র ঘরটিকে যেমন ছোট বানিয়ে ফেলে তেমনি, অনেক সময় দুর্ঘটনারও কারণ হতে পারে। এই ধরুন, যেমন, একটি বিছানা, সাথে দুইপাশে ছোটো আকারের দুইটি / একটি টেবিল। তার উপরে মাঝারি আকারের ল্যাম্প রাখলে আরো আকর্ষণীয় দেখা যাবে আপনার রুম টি। ঘরের একপাশে ড্রেসিং টেবিল, সাথে মানানসই ছোট চেয়ার রাখতে পারেন। তার পাশে আপনার আলমারি রেখালে, আপনার বাকি দুই দেয়াল সম্পূর্ণ আপনার মনের মতো সাজিয়ে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।বিছানার পেছনের দিকে উপরে পারিবারিক একটি ছবির বড় ফ্রেম, অথবা আপনার পছন্দসই কোনো বড় আর্ট সেখানে ঝুলিয়ে দিতো পারেন। অন্য পাশের দেয়ালটি রাখুন সম্পূর্ণ আপনার জন্য। সেখানে ছোট দুই সিটের একটি সোফা অথবা চেয়ার রাখতে পারেন। সেখানে বসে আপনি বই পড়তে পারেন, একান্তে নিজেকে সময় দিতে পারেন। সেই চেয়ারের পাশে লম্বা একটি ল্যাম্প যদি যোগ করতে পারেন, তবে ঘর টি আরো আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
গৃহ সজ্জার আরো আকর্ষণীয় একটি পার্ট হচ্ছে সেই ঘরের পর্দা নির্বাচন করা।  আপনার পর্দার রং এবং ধরণ সঠিক হলে আলো বাতাস চলাচলে সুবিধা তো হবেই, সেই সাথে ঘরটিকে আরো বড় দেখাবে। চেষ্টা করবেন সুতির পর্দা ব্যবহার না করতে। আপনার দেয়ালের রং -এর সাথে শেড মিলিয়ে লিলেনের পর্দাগুলোই ঘরের জন্য বেস্ট।
ঘরের আলো নির্বাচনে আপনাকে থাকতে হবে সতর্ক। ঘরের আলো যাতে একই সাথে স্নিগ্ধ এবং ঐশর্যপূর্ণ হয় সেটি খেয়াল রাখবেন। শোবার ঘরটি একান্ত আপনার । সারাদিনের ক্লান্তি মেটাতে আপনি এখানে বিশ্রাম নেন, এজন্য খুব বেশি শক্তিশালী আলোকসজ্জা এখানে ব্যবহার করবেন না। এতে আপনার শরীরের উপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে, ঘুমের সমস্যাসহ আরো বিভিন্ন শারিরীক সমস্যা দেখা যেতে পারে। এজন্য ঘুমানোর সময়ের জন্য খুব বেশি আলো এমন লাইট না জালিয়ে খুব মৃদু আলো সম্পন্ন লাইট জালানো যেতে পারে। বর্তমানে বাজারে বিভিন্ন ধরণের আলোকসজ্জা পাওয়া যায়। আপনি পছন্দ অনুযায়ী যেকোনো আলোকসজ্জা পেয়ে যেতে পারেন খুব সহজেই।
আপনার ঘরটি সব সময় পরিষ্কার রাখার চেষ্টা করবেন। ঘরটি আপনার সুখ-দুঃখের সাক্ষী আপনার শোবার ঘর। এজন্য আপনার উদ্দেশ্য থাকা উচিত ঘরটিকে আরো আরামদায়ক কিভাবে বানানো যায়। বর্তমানে বিভিন্ন ইনডোর প্লান্ট পাওয়া যাচ্ছে। ঘরের এক কোণে এসকল মাঝারি আকারের ইনডোর প্লান্ট ব্যবহার আপনার রুচিশীলতার পরিচয়ও বটে।
এসকল উপায় বাদেও , নিজের রুচি অনুযায়ী, ঘরের আকার অনুযায়ী বিভিন্ন সজ্জাসমগ্রী ব্যবহার করলেই, ঘরটি হবে আরো আরামদায়ক ও আকর্ষণীয়।

খাবার ঘরের সাজসজ্জা
খাবার ঘরের সাজসজ্জা :
শোবার ঘর , বসার ঘর, অনন্য ঘরের সাজসজ্জায় আমরা সময় দিলেও খাবার ঘরের সাজসজ্জায় সময় ব্যয় করতে অনেকেরই অনীহা দেখা যায়। তবে ব্যস্ত জীবনে, যেখানে পরিবারের সবার সাথে সারাদিন পর দেখা হয়, একসাথে খাওয়া দাওয়া , গল্প হয়, সেই ঘরের সাজসজ্জায়ও একটু আলাদা সময় ব্যয় করা প্রয়োজন। খাবার ঘর টি মূলত পরিবারের যোগসূত্রের স্থান। এজন্য প্রয়োজনী আসবাবপত্রের পাশাপাশি খানিকটা সাজসজ্জাই কিছুটা শখের ছোঁয়া রাখা যেতেই পারে।
আজকাল খাবার ঘরটি খুব একটা বড় হয়না। তবে একটু বুদ্ধিমত্তার সাথে প্রতিটা জায়গা কাজের লাগাতে পারেন অনায়াসে।
পরিবারের সদস্য অনুযায়ী খাবার টেবিল রাখা হয়। বর্তমানে বেশিরভাগ পরিবার একক পরিবার হওয়ায়, সবাই ছয় চেয়ারের খাবার টেবিল রাখাতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এছাড়া বাসনকোসন রাখার জন্য দেয়ালে কাঠের তাক করে কাঁচের পাল্লা দিলে, ঘরের স্পেস যেমন বাঁচবে, তেমন চলাচলেও সমস্যা হবে না। এছাড়াও এই ঘরের একপাশে কাঠের ছোট দেয়াল তাক বানিয়ে তাতে ফুলদানি, ফ্যামিলি ফটো, শো-পিস সহ নানা জিনিস রাখতে পারবেন।
ঘরের একপাশে টোস্টার, ওভেন, কফি মেকার, জুসার রাখার একটি কাঠের ছোট শো-কেস রাখার ব্যবস্থা করতে পারেন।এই শো- কেসের ওপরের অংশটা মার্বেল পাথরের তৈরি হতে পারে। এই তাকের ওপরের আড়াই ফুট অংশে কেবিনেট তৈরি করতে পারেন। কেবিনেটের সামনের দিকটা হতে পারে কাচের। এতে অনেক গুছানো ও পরিপাটি লাগবে আপনার খাবার ঘরটি। এর পাশেই ফ্রিজ থাকতে পারে। রাখতে পারেন ছোট ট্রলিও। এতে করে অতিথি আপ্যায়নের সময় খাবার সাজিয়ে নিয়ে ড্রয়িং রুমে নিতে পারবেন সহজেই।
টেবিলের মাঝে বিছিয়ে দিতে পারেন শতরঞ্জির মতো লম্বা কোনো মোটা কাপড়। ঘরের পর্দা এবং এই কাপড় একই রং এর হলে ঘরটি আরো মনোরম লাগবে।খাবার ঘরের দেয়ালে পারিবারিক ছবি বা প্রাকৃতিক দৃশ্য না রেখে হাতে আঁকা ছবি রাখতে পারেন।খাবার ঘরের আলোর বিষয়টিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। খাবার ঘরে ঝোলানো ল্যাম্প শেড রাখা যেতে পারে। এছাড়া এ ঘরে বেশি মৃদু আলো রাখা শোভনীয় নয়।
খাবার ঘরে জানালা থাকলে তাতে ছোট ছোট ইনডোর প্লান্ট রাখলে পরিবেশ আরো সুন্দর লাগবে।

বসার ঘরের সাজসজ্জা
বসার ঘরের সাজসজ্জা:
আপনার অন্দরমহলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও রুচিপূর্ণ ঘর বসার ঘরটি। কেননা, মেহমান এসেই এই ঘরটিতে বসবেন এবং আপনাকে ও আপনার রুচির বিচার করবেন প্রধানত এই ঘরটি দেখেই। তার আগে আসুন ঘরের প্রবেশপথ নিয়েও একটু আলোচনা হয়ে যাক।
আপনার বাড়িতে আগত অতিথি কলিংবেল বাজিয়ে কিছুক্ষণ হলেও আপনার দরজার সামনে অপেক্ষা করেন, তাই নয় কি? এই সময়টুকুতেই কিন্তু তিনি আপনার বাড়ির সম্পর্কে একটা ধারণা করে নেন।
এজন্য বাসার সামনে দরজার পাশে, আপনার বাড়ির একটা আকর্ষণীয় নেম প্লেট রাখতে পারেন। সাথে ছোট ছোট কিছু ঝুলানো শো-পিস। বাসায় ঢোকার আগের যাতে স্যান্ডেল -জুতা রাখার সঠিক জায়গা থাকে এজন্য বাসার বাইরে সু-রেক রাখা যেতে পারে। এতে বাসায় বাইরের কোনো ময়লা ও জীবাণু
ঢুকতে পারবে না। সু-রেক টি অবশ্যই লক সিস্টেম রাখা আবশ্যকীয়।দরজাটা পলিশ ও রং করে রাখা, দরজার পাশে ফুলের বা অর্নামেন্টাল গাছ রাখা যেতে পারে।
একসময় বসার ঘরের সাজসজ্জা খুব ব্যয়বহুল ভাবে করা হতো। তবে সময়ের সাথে রুচির পরিবর্তন ঘটেছে।এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, আমাদের বসার ঘরটি আয়তনে যেমন বিশাল নয়। এজন্য বসার ঘর যাতে আরামপ্রিয় হয় সেদিকেই খেয়াল রাখা হচ্ছে।
ভারী ভারী সোফা সেটের বদলে কাঠের সিম্পল ডিজাইনের সোফা-টেবিলে হয়ে উঠতে পারে আপনার বসার ঘরটি অনন্য।
বসার ঘরে কুশন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, তাই বিভিন্ন আকারের কুশন রাখা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত নকশা সহ কুশন, কোনো ভাবেই মার্জনীয় নয়।
ওয়াল ক্যাবিনেট বানাতে পারেন। হালকা শোপিস বা অ্যান্টিকের পিস রাখতে পারেন। সাথে আপনাদের ফ্যামিলি ফটো, ছোট ছোট ফুলদানি আপনার রুচিশীলতার পরিচয় দিবে।
বসার ঘরে রাখা যেতে পারে সুন্দর একটি বড় ঘড়ি। তবে যদি ঘরটি বেশি ছোট হয় তবে, ছোট বেশি বড় ঘড়ি দিলে , ঘরটি ছোট দেখাবে।
দুই দেয়ালে একধরনের সোফা সেট এবং অন্য দেয়ালে ডিভান রাখলে ঘরটি আরো বড় দেখাবে।
ঘরের পর্দার সাথে মিল রেখে টেবিল ম্যাট, ফ্লোর ম্যাট ব্যবহার করা যেতে পারে।  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘরকে এমনভাবে সাজিয়ে তুলুন, যেন কমফরটেবল এনভায়রনমেন্ট তৈরি করা যায়। যাতে লোকজন জায়গাটাকে সহজেই আপন করে নিতে পারে।

বাচ্চাদের ঘরের সাজসজ্জা

বাচ্চাদের ঘরের সাজসজ্জা:
শিশুর ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে প্রথমেই নজর দিতে হবে তার বয়সের উপর।
প্রাথমিক ভাবে যেগুলো মাথায় রাখতে হবে, তা হল ঘরের রং, বিছানা-সহ অন্য প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র এবং আলাদা উপাদান যা ঘরটিকে করে তুলবে অনন্য।
বাচ্চাদের ঘর বেশি হালকা বা সাদা রং হলে, বোরিং ঘর হয়ে যাবে। এজন্য তাদের ঘরটি একটু রঙিন রাখা প্রয়োজন। যেকোনো এক পাশের দেয়ালে বিভিন্ন প্যাটার্ন দিয়ে রং করা যেতে পারে। অথবা ক্ষুদে সদস্যর পছন্দের রং অনুযায়ী করা যেতে পারে।
বিছানার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বড় বেড না রেখে বাচ্চার বয়সের চেয়ে সামান্য বড় কিনতে পারেন।
বাচ্চাদের ঘরের মেঝের পরিসর বড় হওয়াই জরুরি। যত্রতত্র জিনিস ছড়িয়ে রাখা নয়, বরং বড় মেঝেয় তারা নিজেদের ইচ্ছেমতো খেলে বেড়াতে পারবে। 
বাচ্চাদের ঘরের অন্যপাশে পড়ার টেবিলে এবং ছোট আয়না সহ একটি আলমারি রাখা যেতে পারে।
ঘরের ছাদটিকেই করে তুলুন এক টুকরো আকাশ। দোকানে অনেক ধরনের গ্লো স্টিকার পাওয়া যায়। চাঁদ, তারা, নক্ষত্রের সেই স্টিকার লাগিয়ে রাখুন ঘরের সিলিংয়ে।
বাচ্চার ঘরের আলো যেন যথেষ্ট পরিমাণে খেলা করতে পারে। এছাড়া আজকাল বাজারে অনেক আকর্ষণীয় লাইটিং পাওয়া যায়। বাচ্চাদের ঘরে সেটি জানালা বা ঘরের কোণে সাজিয়ে দিলো , ঘরটি তাদের জন্য হবে আরো অনন্য।
আপনার বাচ্চার ঘর যেমন তাকে ভাল মানুষ হয়ে উঠতে সাহায্য করবে, তেমনই ওই ঘরটুকুই হয়ে উঠবে তার প্রিয় একান্ত পরিসর।



Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন