সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটা

বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে জেগে ওঠা প্রায় ১৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বেলাভূমির অপর নাম কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত। এটিই পৃথিবীর একমাত্র সৈকত যেখানে দাঁড়িয়েই সূর্যোদয় ও সূর্য়াস্তের মনোরম দৃশ্য অবলোকন করা যায়।

সৈকতে উল্লাসিত পর্যটকেরা

 

অবস্থান:
পটুয়াখালী জেলা শহর থেকে ৭২ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তীরে কুয়াকাটা। এটি কলাপাড়া উপজেলার কুয়াকাটা পৌরসভা ও লতাচাপলী ইউনিয়নের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত। উপজেলা শহর থেকে দক্ষিণে ২২ কিলোমিটার কুয়াকাটার পশ্চিমে আছে আন্ধারমানিক নদের মোহনা, ফাতরার বন, সখিনার সি-বিচ, পূর্ব দিকে চরগঙ্গামতী ও আগুনমুখা নদীর মোহনা।
এই কুয়া থেকেই কুয়াকাটা নামটি এসেছে

 
কুয়াকাটা নামের উৎপত্তি:
প্রাচীন একটি কুয়া থেকে কুয়াকাটা নামটির উৎপত্তি। ১৭৮৪ সালে উপকূলীয় এলাকায় ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রাখাইনদের আগমন ঘটে। বর্মি রাজার নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আরাকানের মেঘবতী অঞ্চল থেকে ১৫০টি রাখাইন পরিবার ৫০টি বড় নৌকা নিয়ে গলাচিপা উপজেলার জনমানবশূন্য রাঙ্গাবালীতে আশ্রয় নেয়। পরে তারা আশপাশে ছড়িয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। বিশুদ্ধ পানির জন্য তারা একটি কুয়া খনন করে। পরে এই কুয়া থেকেই কুয়াকাটা নামটি প্রচলিত হয় বলে জনশ্রুতি আছে। কুয়াটি এখনো আছে।
সূর্যোদয়ের পানে

মনোরম দৃশ্য:
১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ কুয়াকাটা সৈকতে দেখার জন্য সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত। আকাশ পরিষ্কার থাকলে সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য পুরোপুরি দেখা যায়। সৈকতের পূর্ব প্রান্তের চরগঙ্গামতী থেকে সূর্যোদয়ের দৃশ্য ভালো দেখা যায়। যেন মনে হবে—এই তো, কয়েক হাত দূরেই সূর্য উঠেছে। আর পশ্চিম প্রান্তের লেম্বুরচর থেকে দেখা মিলবে সূর্যাস্তের। চরগঙ্গামতী ও লেম্বুরচরে হেঁটেও যাওয়া যায়। আরেকটু আনন্দ চাইলে লাইফবোটেও যাওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া রয়েছে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল। কুয়াকাটা প্যাকেজ ভ্রমণ বোট মালিক সমিতির বোট পর্যটকদের জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকে।
শুটকি পল্লী


কুয়াকাটা সৈকতের ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে রয়েছে শুটকি পল্লী। অর্ধশতাধিক ব্যবসায়ী শীত মৌসুমে বিভিন্ন মাছ শুকিয়ে শুটকি তৈরী করে। পর্যটকরা তাজা মাছ কেটে শুটকিজাত করার দৃশ্য দেখতে ভিড় জমায়। দেখতে পায় খুটা জেলেদের ইলিশ শিকারে সাগরে ঢেউয়ের সঙ্গে মিতালি করা জীবন জীবিকার যুদ্ধ। দেখতে পায় বেড় জালে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকারের অনন্য দৃশ্য।

সমুদ্র সৈকতের পাশেই দেড় শতাধিক একর জমিতে অবস্থিত নারিকেল বাগান যা "নারিকেল কুঞ্জ" নামেই পরিচিত। ১৯৬০ সালে ১৬৭ একর খাস জমি লীজ নিয়ে জনাব ফয়েজ মিয়া ‘ফার্মস এন্ড ফার্মস’ নামে এ বাগান করেন। সৈকতের পূর্ব দিকে রয়েছে মনোরম ঝাউ বাগান। ১৯৯৭/৯৮ অর্থ বৎসরে বন বিভাগ ১৫ হেক্টর জমিতে সি বিচ সংলগ্ন ঝাউ বাগান গড়ে তোলেন। এর পরেই রয়েছে আর এক বিশাল বনাঞ্চল চরগঙ্গামতি। বনের মধ্যে রয়েছে ছৈলা, কেওড়া ও কড়াই বাগান। বিশাল এই বাগানের মাঝে রয়েছে একটি নয়নাভিরাম লেক। কুয়াকাটা সমূদ্র সৈকত থেকে ৫ কিলোমিটার পশ্চিমে লেম্বুর চরে বন বিভাগের একটি বাগান আছে। বনে রয়েছে কড়াই, গেওয়া, ছৈলা ও কেওড়া গাছ। বেড়াতে আসা পর্যটকরা এখানে যায়। আন্ধারমানিক নদীর মোহনার পূর্ব দিকে লেম্বুর চর আর পশ্চিম দিকে রয়েছে ফাতরার চরের বিশাল বনাঞ্চল। ভৌগোলিক ভাবে বরগুনা জেলায় বাগানটির অবস্থান থাকলেও কুয়াকাটায় আগত পর্যটকরা বিনোদনের জন্য সেখানে ট্রলার যোগে সমুদ্রের শান্ত ঢেউ পাড়ি দিয়ে সুন্দরবনসংলগ্ন ফাতরা, লালদিয়া, হরিণবাড়িয়া, সোনাকাটা ইকোপার্কসহ সংরক্ষিত বনাঞ্চলেও ঘুরে আসতে পারেন। হাতে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় নিলেই অপরূপ দৃশ্যের এসব স্থান ঘুরে আসা যেতে পারে। লালদিয়া এবং হরিণবাড়িয়ায় হরিণের দেখা মিলতে পারে। তবে সোনাকাটা ইকোপার্কে গেলে ছায়ার দূরত্বে পেয়ে যাবেন কিছু হরিণ। ইচ্ছে হলে ওই সব হরিণকে নিজ হাতে খাবার খাওয়ানো যায়। এ ছাড়া ধারায় বুনো শুয়োর, বানর আর বনমোরগের দেখা মিলবে। ফিতরার বনানী আর তার ছায়ে এসে পড়ে ভেতরে থাকা খালের টলটলে জলে।
কুয়াকাটা থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে মিসরিপাড়ায় দেশের সবচেয়ে বড় এই বৌদ্ধ মূর্তিটি


কুয়াকাটা সৈকতের পাশেই ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রাখাইনপল্লি। সেখানে একটু সময় কাটালেই রাখাইনদের বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রার বিভিন্ন দিক জানা যেতে পারে। হাসিখুশি স্বভাবের রাখাইনরা মিশুক প্রকৃতির। কুয়াকাটা প্রেসক্লাবের পাশেই রাখাইন কালচারাল একাডেমি। এর দক্ষিণে বৌদ্ধমন্দির ও কিংবদন্তি কুয়াটি। মন্দিরে গৌতমবুদ্ধের সোনালি রঙের সাড়ে ৩৭ মণ ওজনের বিশাল ধাতব মূর্তি আছে। তবে দেশের সবচেয়ে বড় বুদ্ধমূর্তিটি দেখতে চাইলে মিসরিপাড়ার ঠাকুরবাড়িতে যেতে হবে। কুয়াকাটা থেকে আট কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে মিসরিপাড়া। রিকশাভ্যানে, অটোরিকশা বা ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে চড়ে সেখানে যাওয়া যাবে।সেখানে গেলে দেখতে পাবেন সারি সারি রাখাইন দোকান এবং তাদের কারুকার্যে ভরা বিভিন্ন রকম কাপড়,কুটিরশিল্প। চাইলেই কিনে নিতে পারেন প্রিয়জনের জন্য কিছু উপহার সামগ্রী। 

সৈকতে এসে সমুদ্রের জলে না ঘুরে চলে গেলে আফসোস হতে পারে। তাই সমুদ্র শান্ত থাকলে সাহস করে একটু ঘুরেই আসতে পারেন। লাইফবোট নিয়ে অথবা ইঞ্জিনচালিত ট্রলারে করে সমুদ্রের ভেতরে অনেক দূর পর্যন্ত ঘুরে বেড়ানোর ব্যবস্থা রয়েছে।এ ছাড়া সৈকতঘেঁষা বনাঞ্চল ঘুরে, ঘোড়ায় চরে, ভাড়ায় মোটরসাইকেল নিয়ে অথবা সূর্যস্নান করে দিব্যি সময় কাটানো যায় এই সৈকতে। টুকিটাকি শৌখিন কিছু কিনতে চাইলে রাখাইন মহিলা মার্কেটসহ বেশ কিছু দোকান আছে।

কুয়াকাটায় রাতের দৃশ্য আরো মনোমুগ্ধকর। সন্ধার পর যেন উচ্ছ্বসিত ঢেউয়ের সাথে উল্লাসে মেতে ওঠে সৈকত ভরা পুরো পর্যটকেরা।সামনে সমুদ্রের অসীম অন্ধকার এবং পেছনে সারি সারি দোকানের ক্ষুদ্র আলোর মাঝের সৈকতটি যেন হয়ে ওঠে মোহনীয়।মাঝে মাঝে দেখা মিলবে অসংখ্য ফানুসের আলো।শুঁটকির দোকান গুলোতে উপচে পড়া ভিড়,হাজারো পর্যটক মাছের দর কষাকষিতে ব্যস্ত এবং ফিশ ফ্রাই,রোস্ট,বারবিকিউ এ মজে থাকবে সবাই।অসংখ্য মানুষ ব্যস্ত থাকে সারি সারি দোকানে বাহারি পণ্য কেনায়।

কুয়াকাটায় সহজেই একদিনের একটা পিকনিক ট্যুর দিতে পারেন, তাঁদের জন্য সৈকতঘেঁষা নারকেলবাগান, ঝাউবাগান, গঙ্গামতী, লেম্বুরচর এলাকায় পিকনিক স্পট রয়েছে। এ ছাড়া রাখাইনপল্লি এলাকাতেও অনেকে পিকনিক করেন।পিকনিকের পূর্বের দিন সন্ধায় রওনা করে খুব ভোরে পৌঁছাতে পারবেন,এবং বুকিং দেওয়া কোন হোটেলে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন সূর্যোদয় দেখতে। ফিরে এসে বিশ্রাম করে সকাল ১১.০০ টার দিকে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে সৈকতে মেতে উঠতে পারেন আনন্দ উল্লাসে।দুপুরে খাবার সেরে বিশ্রাম করে বিকালের সৌন্দর্য অবলোকনে বেরিয়ে সূর্যাস্ত উপভোগ করে শুটকি,বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের বারবিকিউ উপভোগ করে রাতে ফেরার জন্য রওনা করতে পারেন।
সৈকত


কিভাবে যাবেন:
নদী ও সড়ক—দুই পথেই কুয়াকাটা যেতে পারেন। উড়োজাহাজে করে বরিশাল হয়েও কুয়াকাটা পৌঁছানো যায়। যদি আপনি নদীপথ খুব পছন্দ করে থাকেন তাহলে নির্দ্বিধায় ঢাকার সদরঘাট থেকে প্রতিদিন সন্ধ্যায় তিনটি বড় লঞ্চ পটুয়াখালীর উদ্দেশে ছেড়ে আসে,সেটিতে চেপে বসতে পারেন। ভোরে লঞ্চগুলো পটুয়াখালী পৌঁছায়। এরপর সকাল থেকে প্রতি ৪০ মিনিট পরপর পটুয়াখালী বাস টার্মিনাল থেকে কুয়াকাটার উদ্দেশে বাস ছেড়ে যায়,বাসগুলোতে চড়ে সকালের ভেতর পৌঁছে যাবেন কলাপাড়ায়,বাস থেকে নেমেই দেখতে পাবেন সমুদ্র সৈকত। সড়কপথে যেতে চাইলে ঢাকার গাবতলী ও সায়েদাবাদ থেকে সরাসরি বাসে যাওয়া যাবে। শীতাতপনিয়ন্ত্রিত বাসও এই পথে চলাচল করে। দেশের প্রায় সব জেলা থেকেই কুয়াকাটার উদ্দেশে যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে।বিশেষত প্রতি জেলা থেকেই বিআরটিসির বাস পাওয়া যাবে এবং তুলনামূলক কম খরচেই কুয়াকাটা পৌঁছানো যাবে।

থাকার স্থান:
কুয়াকাটায় সরকারি ও বেসরকারি মিলে ৫০টি হোটেল, মোটেল, রেস্টহাউস ও গেস্টহাউস রয়েছে। বাঁধের উত্তর পাশে রয়েছে পর্যটন করপোরেশনের মোটেল হলিডে হোমস। এ ছাড়া জেলা পরিষদ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি, সড়ক বিভাগের ডাকবাংলো রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা হলে এগুলোতে নির্ধারিত হারে ছাড় পাওয়া যাবে।
সাধারণ পর্যটকদের ও চিন্তার বিষয় নাই।যেকোন হোটেলেই আগে থেকে বিভিন্ন ক্যাটাগরির রুম বুকিং দিতে পারবেন,এছাড়া ওখানে পৌঁছে একটু খুঁজলেই পেয়ে যাবেন পছন্দসই হোটেল এবং রুম।
 

2 মন্তব্যসমূহ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন