বাংলাদেশে কাঁসা পিতলের শিল্প অনেক পুরোনো। এই তামা পিতল, কাঁসা থেকে গৃহস্থলীতে ব্যবহৃত তৈজস্ব উৎপাদন থেকে শুরু করে তৈরি হতো বিভিন্ন নকশার চোখ জুড়ানো সব ভাস্কর্য। চকচকে কাঁসার নিঁখুত এসব শিল্প আমাদের দেশের অনেকের কাছে অপরিচিত থাকলেও এই শিল্পের কদর এখন বিশ্বজুড়ে।
অনেকে কাঁসা ও পিতল কে এক মনে করলেও মূলত এরা এক নয়।
৮০ শতাংশ তামা এবং ২০ শতাংশ টিন মিশিয়ে তৈরি হয় শংকর ধাতু কাঁসা। তামা ও টিনকে নির্দিষ্ট মাত্রায় মিশিয়ে ৭০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় গরম করে এই সুপার ধাতু তৈরি হয়। এই ধাতুর বাংলায় কাঁসা এবং ইংরেজিতে বেল মেটাল (Bell Metal) নামে পরিচিত ।
অনেকের মনে প্রশ্ন থাকতে পারে তামা ও কাঁসার মধ্যে পার্থক্য কি?
তামা টকজাতীয় খাবারের সংস্পর্শে এসে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে, ধাতুর রং নষ্ট করে। এছাড়া নোনতা খাবারেও তামায় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সেই কারণে তামা ও টিনের শংকর ধাতু কাঁসায় কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না। তাই রান্নার কাজে কাঁসার ব্যবহার ই উত্তম মনে করা হয়।
এছাড়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন কাঁসার তৈজসপত্র ব্যবহার শরীরের জন্য উপকারী। কাঁসা-তামার পাত্রে পানি পান করলে রোগ সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়া থেকে দেহকে রক্ষা করে, শরীর সুস্থ রাখতে সহায়তা করে। এসকল ধাতুর পাত্রে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গুণ থাকে। যেটা ক্যান্সারের মতো গুরুতর রোগের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করতে সাহায্য করে। আমেরিকান ক্যান্সার সোসাইটির মতে, তামা-কাঁসার মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিক্যানসার উপাদান। এটি ক্যান্সারের সূত্রপাত প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
| কাঁসা শিল্প |
বাংলার প্রাচীনতম শিল্পের মধ্যে কাঁসা শিল্প একটি। বাংলার চন্দ্র বংশীয় রাজবংশের শাসনামল থেকে পদ্মা-কীর্তিনাশার তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল কাঁসা-পিতল শিল্প। এছাড়া মোঘল আমলেও কাঁসা পিতলের বেশ সমাদর লক্ষ্য করা যায়। সেসময় গহনা, তলোয়ার, ফুলদানি, তৈজসপত্র বিভিন্ন জায়গায় কাঁসার ব্যবহার পাওয়া যায়।
কাঁসা শিল্প শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষের কাছেও বেশ গর্বের বিষয়। বাংলাদেশের শরিয়তপুর জেলার পালং, বাঘিয়া, বিলাসখান, কাঁসাভোগ, মধ্যপাড়া, আংগারিয়া ও কোটাপাড়া এলাকায় কাঁসারুদের বসবাস ছিল। আর এ সকল এলাকার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাঁসা-পিতল তৈরীর কারখানার অস্তিত্ব ছিল। আমাদের দেশে এই শিল্পের চর্চা এখন খুব কম হলেও ধামরাই, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, নরসিংদি এসব জায়গাতে এখনো চলে তামা – কাঁসা – পিতলে শিল্প সৃষ্টির প্রয়াস। কাঁসার ব্যবহার প্রাচীনকালে এটি আভিজাত্যের প্রকাশই ছিল বটে। ক্রমবর্ধমান চীনা মাটির দ্রব্যের বহুল প্রচলন ও কম মূল্যের কারণে কাঁসার তৈরী দ্রব্যাদির ব্যবসা কঠিন হয়ে পরছে। দেশের চাহিদা মিটিয়েও কাঁসা ও পিতলের তৈজসপত্র বিদেশেও রফতানি হতো। কাঁসার কদর এদেশের মানুষ দিতে ভুলে গেলেও, এক একটি কাঁসার নিখুঁত মূর্তি, ঘর সাজানোর সরঞ্জামাদি বিদেশে কয়েক হাজার ডলারে বিক্রি হচ্ছে। এজন্য কাঁসা-পিতলের ব্যবহার বাড়াতে হবে। তবেই বাঁচবে এ শিল্প। ক্রেতার সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে এবং উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে কাঁসাশিল্প ফিরে পেতে পারে নিজস্বতা।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন